ডা. ওয়াজেদ খান : | বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ফ্যাসিস্ট হাসিনা। ইতিহাসের নজিরবিহিন এ ঘটনায় দলীয় নেতৃবৃন্দ সহ তিনি আশ্রয় নিয়েছেন ভারতে। এদিকে দেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় হবে সহসাই। তার দলের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধেও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ডজন ডজন মামলা বিচারাধীন। হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করতে তাকে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ সরকারের দাবি আমলে নেয়নি ভারত। সম্ভাব্য ফাঁসির আদেশ মাথায় নিয়ে হাসিনা দেশে ফিরবেন এমনটি ভাবার কোন কারণ নেই। তা আওয়ামী মহল থেকে যতো অপপ্রচারই চালানো হোক না কেন। এছাড়া দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির অংশগ্রহণ কিংবা রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের কোন সম্ভাবনাও নেই। তবে অদূর ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দলটির পুনর্বাসনের একমাত্র পথ হয়ে উঠতে পারে নির্বাচন। রাজপথে আন্দেলন সংগ্রাম করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসিত হবে অতীত ইতিহাস এমন সাক্ষ্য দেয় না। কেন নির্বাচন এবং নির্বাচনই হতে পারে আওয়ামী লীগের পুর্নবাসনের একমাত্র উপায় এমন ধারণা নিয়ে প্রশ্ন উঠা খুবই যৌক্তিক।
নির্বাচনের সাথে আওয়ামী পুনর্বাসনের সম্পর্ক
নানা কারণেই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দাঁড়িয়েছে জাতীয় রাজনৈতিক জীবনের টার্নিং পয়েন্টে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ কি আবারো রাজনীতির পুরনো পথেই হাঁটবে? নাকি জুলাই সনদের ভিত্তিতে এগুবে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দিকে। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধ ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে এর দায়ভার বহন করতে হবে অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকেই। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে শুধু দেশের রাজনৈতিক দলগুলোই নয়, অতীতের মতো ভারত এবারো হাতে নিয়েছে বড় ধরণের প্রকল্প। ভারত শেখ হাসিনাকে এই মূহুূর্তে প্রত্যাবর্তন করাতে না পারলেও পরিকল্পনা গ্রহন করেছে তার দল আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের। এজন্য দেশটি বেছে নিয়েছে ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে। যে কারণে চব্বিশের ৮ আগষ্ট ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকেই ভারত বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে সম্পর্ক গড়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে আসছে। এমনকি দেশটির সেনাপ্রধান ও অন্যান্য কর্মকর্তাগণ বাংলাদেশে দ্রুত নির্বাচনের কথা উল্লেখ করছেন বারবার।
ভারত এজন্য কৌশলী ছক এঁকেছে। আশ্রয় নিয়েছে চাণক্যনীতির। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এমন একটি রাজনৈতিক দলের সাথে ইতোমধ্যেই বোঝাপাড়া হয়েছে দেশটির। যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে আওয়ামী শাসনামলের মতো নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলবে ভারতের সাথে। রক্ষা করবে ভারতের সকল স্বার্থ। যার অন্যতম শর্ত হবে হাসিনাবিহিন আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া। এজন্য ভারত সবধরণের সহযোগিতা প্রদান করবে দলটিকে নির্বাচনে বিজয়ী হতে। নির্বাচনে আওয়ামী ভোট ব্যাংকও ক্যাশ করার অবাধ সুযোগ পাবে দলটি।
এখন স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে ভারতের পছন্দনীয় রাজনৈতিক দল কোনটি এবং দৃশ্যত কোন দলের জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। এক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী অবশ্যই ভারতের পছন্দের দল নয়। তাছাড়া পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি’র বিজয়ের বিষয়টি নিশ্চিত। ফলে উঠে আসে বিএনপির নাম। বিগত প্রায় দেড় যুগ ধরে বিএনপি নেতৃত্বের একটি প্রভাবশালী অংশ নানাভাবে চেষ্টা করেছেন ভারতের সাথে সম্পর্ক গড়তে। যারা দলের অভ্যন্তরে কাজও করছেন ভারতের স্বার্থের পক্ষে। চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের অবর্তমানে মহলটি এখন অনেকটাই সক্রিয়। এরাই পাঁচ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর বাহাত্তুর ঘন্টা না পেরুতেই নব্বই দিনের মধ্যে দাবি জানান নির্বাচনের। জিকির তুলেন দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের।
রাষ্ট্র সংস্কার, ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিচার এবং গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসনের চেয়ে তারা বড় করে দেখতে থাকেন নির্বাচনকে। কারণ দলটি জানে যতো দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তত দ্রুত তারা আরোহন করতে পারবেন ক্ষমতার মসনদে। তাছাড়া যে কোন মূল্যে ক্ষমতায় যেতে আগ্রহী এ দলটি। কিন্তু নানামূখী চাপে বিএনপিকে বাধ্য হতে হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় যোগদান এবং জুলাই সনদে স্বাক্ষর করতে। এর আগে গত জুনে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সাথে অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সমঝোতা হয় লন্ডনে। এরমধ্য দিয়ে ডঃ ইউনুসের নিজ সরকারের মেয়াদকাল দীর্ঘায়িত করার যে পরিকল্পনা ছিলো তা ভেস্তে যায়। সরকারের গুটিকয় উপদেষ্টা এই সমঝোতার মাধ্যমে ভবিষ্যত বিএনপি সরকারে নিশ্চিত করে নিয়েছেন নিজেদের নিরাপদ অবস্থান।
দায়মুক্তির নির্বাচনে আগ্রহী যারা
আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে শুধু আওয়ামী পুনর্বাসনের ভারতীয় প্রকল্পই নয়, নিজেদের দায়মুক্তির জন্য অপেক্ষমান রয়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গ। বিশেষ করে ফ্যাসিস্ট আমলের সুবিধাভোগী সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তা, সরকারি আমলা, বড় ব্যবসায়ী, সংবাদ-মাধ্যম, একশ্রেনীর সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মী যারা প্রচন্ড চাপে আছেন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। গুম,খুন, দুর্নীতি, অর্থপাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী যারা এখনো আইনের আওতায় আসেনি এখন তাদের রাত কাটছে নির্ঘুম। উদ্বেগ-উৎকন্ঠা, অনিশ্চয়তা পিছু ছাড়ছে না তাদের। কখন কার ডাক পড়ে, কোন অভিযোগে গ্রেফতার হন। কোন ভাবেই ডঃ ইউনূস সরকারের উপর বিশ্বাসী হতে পারছে না তারা। রাষ্ট্রের সিংহভাগ অর্থবিত্তের মালিক এই শ্রেনীর একমাত্র ভরসা এখন নির্বাচন। তারা ভাবছেন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত নতুন সরকার সহনশীল হবে, শ্লথ হয়ে যাবে ধরপাকড়, মামলা মোকদ্দমা। বিভিন্ন অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পাবেন তারা।
জামিনে কারাগার থেকে বেড়িয়ে আসবেন বড় বড় রাঘব বোয়াল। রাষ্ট্র ফিরে যাবে পূর্বাবস্থায়। তারা ফিরবেন টেনশনমুক্ত নিরাপদ জীবনে। দেশ বিদেশে পালিয়ে থাকা আওয়ামী নেতারা ফিরবেন স্বদেশে। সচল হয়ে উঠবে বন্ধ থাকা লাখো মোবাইল। দুর্দিনে আওয়ামী লুটেরাদের ধন-সম্পদের রক্ষকরা ফিরবেন সহাবস্থানে। এজন্য অপেক্ষা শুধুমাত্র একটি নির্বাচনের। বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের বিপক্ষ অবস্থানে। এমনকি দলটি চায় ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ। দলটির এমন আওয়ামী প্রীতি জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন জুলাই যুদ্ধারা। এছাড়া জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্র সংস্কারের অনেক বিষয়ে আপত্তি রয়েছে বিএনপির। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোট নিয়েও বিএনপির সাথে বড় ধরণের মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে সরকার ও অন্যান্য দলের সাথে। ফলে নির্বাচন নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরণের অনিশ্চয়তা। এ ব্যাপারে দলগুলো ঐকমত্যে পৌছতে না পারলে দেখা দিতে পারে বড় ধরণের সংকট। অনেকের আশংকা ওয়ান ইলেভেন স্টাইলে দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে এগুতে পারে রাষ্ট্র। দীর্ঘ সময় ধরে আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রনে মাঠে কাজ করছে সেনাবাহিনী। এর অবসান চায় তারা। তাছাড়া সেনা কর্মকর্তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে রয়েছে গোটা বাহিনী। এসব কারণে সেনাবাহিনীর নিকটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দ্রুত নির্বাচনের বিষয়টি। গত ৫নভেম্বর সেনাসদরে সেনাবাহিনী সংবাদ সম্মেলন করেছে এ প্রসঙ্গে।
ফেব্রুয়ারি প্রথমার্ধে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং ঐতিহাসিক নির্বাচন অবশ্যই জরুরী। অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দল সমূহ, জনগণ, নির্বাচন কমিশন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নির্মোহভাবে কাজ করতে হবে। কোন দেশী-বিদেশী শক্তির প্রভাব, প্রাধান্য এবং পক্ষপাতমূলক আচরন যেন নির্বাচনকে বাঁধাগ্রস্থ না করে অবশ্যই তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন বা চক্রান্ত নির্বাচনকে যাতে প্রভাবিত না করে সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে দেশবাসীকে। ভুলে গেলে চলবে না যে নির্বাচন হলেই দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়না।
যেমনটি হয়নি বিগত ১২টি সংসদ নির্বাচনের পর ৫৪ বছরে। ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর এমনটি না হবার কোন গ্যারান্টি নেই। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের একজন নেতাও এখন পর্যন্ত চব্বিশের গণহত্যা, গুম-খুনের জন্য মাফ চাওয়াতো দূরের কথা এজন্য তারা সামান্যতম অনুতপ্ত নয়। গণহত্যার দায় কোনভাবেই এড়াতে পারে না দলটি। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কোন ব্যক্তি বা দলের দায়মুক্তি ও পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে না কিছুতেই। এক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষের অপরাধ কর্মের দায় সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের উপর চাপানোর সুযোগ নেই। মানবতাবিরোধী অপরাধ কর্মে জড়িত ও সহায়তাকারীদেরকে অবশ্যই জনগণের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা ও আইন আদালত মেনে রাজনীতির স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে হবে।
Posted ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh